নেতাজী ও আজাদ হিন্দ-বাহিনী – Netaji and Azad Hind-forces

আজাদ হিন্দ-বাহিনী, Netaji and Azad Hind-forces, নেতাজী ও আজাদ হিন্দ-বাহিনী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

Table of Contents

Netaji and Azad Hind-forces

• • নেতাজী ও আজাদ হিন্দ-বাহিনী : ভারতের অভ্যন্তরে আগস্ট বিপ্লব যখন গতিহীন হয়ে পড়েছে, তখন ভারতের বাইরে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রবল রূপ ধারণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বৈদেশিক শক্তির সাহায্যে। ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আলাপ-আলােচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ইংরেজ কোন দিনই ভারতবাসীকে স্বাধীনতা দান করবে না। ব্রিটিশ সরকারও সুভাষচন্দ্রের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক ছিল। এই কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভারত সরকার তার চরম শত্রু সুভাষচন্দ্র বসুকে ‘ভারত রক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করে (২রা জুলাই ১৯৪০ খ্রিঃ)।কারাগারে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে কলকাতায় তার নিজগৃহে সশস্ত্র পুলিশ প্রহরায় অন্তরীণ করে রাখা হয় (৫ই ডিসেম্বর, ১৯৪০ খ্রিঃ)। এই অবস্থায় সদা সতর্ক পুলিশের দৃষ্টি এড়িয়ে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই জানুয়ারি তিনি কলকাতা ত্যাগ করেন এবং প্রবল দুঃসাহসের ওপর। ভর করে, অতি দুর্গম পথে কাবুলের মধ্য দিয়ে ভারত ত্যাগ করে আফগানিস্তান হয়ে রাশিয়া পৌছন এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সােভিয়েত সাহায্য প্রার্থনা করেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু সােভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান স্ট্যালিন এ সময় সােভিয়েতের ওপর আসন্ন জার্মান আক্রমণের বিরুদ্ধে ইংরেজদের মিত্রতা আশা করতেন। সুতরাং সুভাষচন্দ্রের পক্ষে সােভিয়েত সাহায্য-প্রাপ্তির কোনসম্ভাবনা ছিল না। এমতাবস্থায় তিনি মস্কো থেকে এরােপ্লেনে করে ২৮শে মার্চ জার্মানীতে হাজির হন। তিনি জার্মানীতে হিটলার এবং ইটালীতে মুসসালিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং এই দুই রাষ্ট্রনায়ক ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাকে সর্বতােভাবে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। জার্মান সরকারের পূর্ণ সহযােগিতায় ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বার্লিনে ‘আজাদ হিন্দুস্থান’ বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নাম্বিয়ার নামক ভারতীয় দেশপ্রেমিক ছিলেন এর পরিচালক। সুভাষচন্দ্র সেখান থেকে নিয়মিতভাবে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার চালাতে থাকেন। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের

Read More : মহাত্মা গান্ধীর জীবনি – Biography Of Mahatma Gandhi In Bengali

READ ALSO  ওয়ারেন হেস্টিংস-এর শাসন সংস্কার, ১৭৭২-৮৪ খ্রিঃ

ডিসেম্বর মাসে জার্মানীর হাতে বন্দী ৪০০ ভারতীয় সৈন্য নিয়ে তিনি স্বাধীন ভারতীয় লিজন’ (‘Free India Legion’) নামে এক সেনাদল গঠন করেন। এই বাহিনীর প্রতীক ছিল ‘উল্লমকারী ব্যাঘ্র’। বলা বাহুল্য, এটাই হল তার আজাদ-হিন্দ-ফৌজের প্রথম পরিকল্পনা। জার্মানীতে বন্দী সেনাদল তার দেশপ্রেম ও বিপ্লবী আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে প্রথম তাকে ‘নেতাজী’ আখ্যায় ভূষিত করে এবং ‘জয়হিন্দ’ ধ্বনি দিয়ে অভিবাদন জানায়।

১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ই ডিসেম্বর জাপান মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করে। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই ফেব্রুয়ারি জাপানের হস্তে সিঙ্গাপুরের পতন ঘটলে ১৪ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মােহন সিং-সহ প্রচুর ভারতীয় সৈন্য জাপানের হাতে বন্দী হয়। মােহন সিং-এর নেতৃত্বে বন্দী সৈন্যরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যােগ দিতে রাজি হয়। তার চেষ্টায় এশিয়ায় জাগরণ ২৫,০০০ ব্যক্তি এই সেনাদলে যােগদান করে এবং অচিরেই এই সংখ্যা ৪০,০০০-এ পৌছায়।

প্রখ্যাত ভারতীয় বিপ্লবী রাসবিহারী বসু তখন জাপানে ভারতের স্বাধীনতার জন্য সক্রিয় ছিলেন। তাকে পূর্ব এশিয়ায় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের জনক’ (‘Father of the Indian Independence movement in East Asia‘) বলা হয়। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই জুন তার রাসবিহারী বসু সভাপতিত্বে ব্যাঙ্ককে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবাসী স্বাধীনতাকামী ভারতীয়দের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেডেন্স লীগ’ বা ‘ভারতীয় স্বাধীনতা সঙঘ’ গঠিত হয় এবং রাসবিহারী বসু তার সভাপতি হন। এই সম্মেলনে সুভাষচন্দ্রকে জার্মানী থেকে জাপানে আহ্বান করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর রাসবিহারী বসু আনুষ্ঠানিকভাবে সিঙ্গাপুরে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন। এই সেনাবাহিনী ঐক্য, আত্মবিশ্বাস ও আত্মােৎসর্গ—এই তিনটি আদর্শের ভিত্তিতে ভারতকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করতে তৎপর ছিল। প্রতিষ্ঠাকালে মােহন সিং ছিলেন এর প্রধান সেনাপতি।

১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই জুন প্রচণ্ড দুঃসাহসে ভর করে বিপদসংকুল সমুদ্রে সাবমেরিনে কয়েক হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে সুভাষচন্দ্র জার্মানী থেকে জাপানের রাজধানী টোকিওতে হাজির হন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী তােজা তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানান এবং জাপানী পার্লামেন্ট জাপানে সুভাষচন্দ্র ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভারতীয় মুক্তি সংগ্রামকে সর্বতােভাবে সাহায্যের নীতি ঘােষণা করে। সুভাষচন্দ্রের আগমনে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয়দের মনে প্রবল উদ্দীপনা দেখা দেয়।

READ ALSO  শেয়ার বাজার কি এবং এর কাজ (Functions of the Stock Exchange)

১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা জুলাই সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এক বিশাল সভায় রাসবিহারী বসু সুভাষচন্দ্রের হাতে ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেডেন্স লীগ’-এর সকল দায়িত্ব অর্পণ করেন। ২৫শে আগস্ট সুভাষচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে আজাদ হিন্দ বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ আমুল পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন। দলে দলে হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ ও বালক বালিকা এই সেনাদলে যােগদান করতে থাকে। এই সেনাদলে কয়েকটি ব্রিগেড বাহিনী ছিল। সেগুলি হল গান্ধী ব্রিগেড’, ‘আজাদ ব্রিগেড’ ও ‘নেহরু ব্রিগেড। বালক-বালিকাদের নিয়ে গঠিত ছিল ‘বাল-সেনাদল’। শ্রীমতী লক্ষ্মী স্বামীনাথনের নেতৃত্বে নারীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল ঋসীর রানী ব্রিগেড। এছাড়া, কিছু বাছা বাছা সেনা নিয়ে একটি ব্রিগেড গঠিত হয়
এবং নেতাজীর প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার নাম হয় সুভাষ ব্রিগেড। শাহনওয়াজ খান-এর নেতৃত্বে এই বাহিনীই সর্বাগ্রে রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হত। শাহনওয়াজ খান ছাড়াও জি. এস. ধীলন ও পি. কে. সায়গল ছিলেন আজাদ-হিন্দ বাহিনীর দুই বিশিষ্ট সেনাধ্যক্ষ। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ২১শে অক্টোবর নেতাজী সিঙ্গাপুরে ‘আজাদ হিন্দ সরকার বা স্বাধীন ভারত সরকার প্রতিষ্ঠার কথা ঘােষণা করেন। ২৩শে অক্টোবর আজাদ-হিন্দু-সরকার ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করে। সামান্য কয়েক দিনের মধ্যেই। জাপান, থাইল্যান্ড, জার্মানী, ইটালী প্রভৃতি পৃথিবীর নয়টি রাষ্ট্র এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। ৬ই নভেম্বর জাপানের প্রধানমন্ত্রী তােজো আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দামান ও নিকোবর আজাদ-হিন্দু-সরকার দ্বীপপুঞ্জ দু’টি আজাদ-হিন্দ সরকারের হাতে তুলে দেন। ৩১শে ডিসেম্বর নেতাজী এই দু’টি দ্বীপপুঞ্জের নাম রাখেন যথাক্রমে শহীদ’ ও ‘স্বরাজ। দলে দলে ভারতীয়রা আজাদ-হিন্দু বাহিনীতে যােগদান করেন। নেতাজীর আহ্বানে প্রবাসী ভারতীয়রা মুক্তহস্তে যুদ্ধ তহবিলে দান করতে থাকেন।

১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা জানুয়ারি নেতাজী রেঙ্গুন-এ যান এবং সেখানে তার প্রধান সামরিক দপ্তর স্থাপিত হয়। অতঃপর শুরু হয় আজাদ-হিন্দ বাহিনীর ভারত অভিযান। সেনাদলের সামনে তিনি ধ্বনি দেন ‘দিল্লী চলাে’, কারণ দিল্লী ভারতের রাজধানী। জাপানী নেতৃবৃন্দের সহযােগিতা, নেতাজীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও উজ্জীবনী মন্ত্রে দীক্ষিত আজাদ-হিন্দ বাহিনী অমিত বিক্রমের সঙ্গে মণিপুরের অন্তর্গত কোহিমা শহরটি দখল করে এবং রাজধানী ইম্ফল দখলের জন্য অগ্রসর হয় (এপ্রিল, ১৯৪৪ খ্রিঃ)। ভারতীয় এলাকার প্রায় ১৫০ মাইল ব্রিটিশ শাসন মুক্ত করতে সক্ষম হয়।

READ ALSO  রংপুর বিদ্রোহ ১৭৮৩ (The Rangpur Uprising)

ইতিমধ্যে আমেরিকা জাপানের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলে যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হয়। স্বদেশ রক্ষার্থে জাপানী বিমানবহর ও সেনাবাহিনী প্রশান্ত মহাসাগর অভিমুখে প্রস্থান করলে বিমানের অভাবে আত্মসমর্পণ আজাদ-হিন্দ বাহিনী প্রবল অসুবিধার সম্মুখীন হয়। এছাড়া, নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই বর্ষা নামায় এবং সৈনিকদের ন্যূনতম প্রয়ােজনীয় খাদ্য ও সাজ-সরঞ্জামের অভাবে আজাদ-হিন্দ বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। খাদ্যাভাব, রােগ, শীত, ম্যালেরিয়া এবং পার্বত্য অঞ্চলের বিষাক্ত পােকার কামড়ে হাজার হাজার সৈন্য মৃত্যুবরণ করে। অবশেষে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট জাপান মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে আজাদী সেনাদলও অস্ত্র ত্যাগে বাধ্য হয়। সহকর্মীদের পরামর্শে নেতাজী আত্মসমর্পণ থেকে বিরত থাকেন। কথিত আছে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই আগস্ট এক বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। বলা বাহুল্য, এই কাহিনীর সত্যতা সম্পর্কে সকলে এক মত নন।

জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে আজাদ-হিন্দু বাহিনীর অমিত বিক্রম ও শৌর্যবীর্য অতুলনীয়।
(১) খাদ্য ও সাজ-সরঞ্জামের অভাব এবং প্রবল বাধাবিঘ্ন সত্ত্বেও তারা উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ১৫০ মাইল এলাকাকে স্বাধীন করতে সক্ষম হয়।
(২) তাদের কার্যকলাপ ব্রিটিশকে বুঝিয়ে দেয় যে, ভারতে তাদের দিন শেষ হয়ে এসেছে।
(৩) আজাদ-হিন্দ বাহিনীর শৌর্যবীর্য দেশবাসীর মনে প্রবল জাতীয়তাবাদী আশা-আকাক্ষার সঞ্চার করে। দিল্লীর লালকেল্লায় বন্দী সৈন্যদের বিচার শুরু হলে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তেজবাহাদুর সম্পু, ভুলাভাই দেশাই, জওহরলাল নেহরু প্রমুখ কংগ্রেস নেতা বন্দী আজাদী সেনাদের পক্ষ সমর্থন করেন। প্রবল গণ-বিক্ষোভের ফলে দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আজাদী সৈন্যদল মুক্তি পায়।
(৪) আজাদ-হিন্দু বাহিনীর দৃষ্টান্ত অনুসারেই পরবর্তীকালে ভারতে নৌ-বিদ্রোহ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রাক্তন ব্রিটিশ সামরিক গােয়েন্দা অফিসার হিউ টয় (Hugh Toye) মন্তব্য করেন—“এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, আজাদ-হিন্দ ফৌজ ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘনিয়ে তােলে যুদ্ধক্ষেত্রে ভাগ্যবিড়ম্বনার ভেতর দিয়ে নয়, বজ্রনির্ঘোষে ভেঙে যাওয়ার ভেতর দিয়ে।”

[gtranslate]

Leave a Comment