রংপুর বিদ্রোহ ১৭৮৩ (The Rangpur Uprising)

রংপুর বিদ্রোহ ১৭৮৩, রংপুর বিদ্রোহ কেন হওয়ার কারণ, রংপুর বিদ্রোহ কেন হয়েছিল ও তার কারণ, রংপুর বিদ্রোহ কি এবং হওয়ার কারণ।

Read More : নেতাজী ও আজাদ হিন্দ-বাহিনী – Netaji and Azad Hind-forces

Read More : মহাত্মা গান্ধীর জীবনি – Biography Of Mahatma Gandhi In Bengali

রংপুর বিদ্রোহ, ১৭৮৩ খ্রিঃ (The Rangpur Uprising)


১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানীর ইজারাদার দেবী সিংহের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রংপুরের কৃষকদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম বাংলা তথা ভারতের কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

রংপুর বিদ্রোহ ১৭৮৩

দেবী সিংহের পরিচয়

দেবী সিংহ ছিলেন পশ্চিম ভারতের পানিপথের নিকটবর্তী এক গ্রামের বৈশ্য সম্প্রদায়ভুক্ত এক ভাগ্যান্বেষী। ব্যবসা উপলক্ষে তিনি মুর্শিদাবাদে আসেন এবং তৎকালীন বাংলার নায়েব নাজিম’ রেজা খা-কে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পূর্ণিয়ার ইজারা এবং সেই সঙ্গে এই প্রদেশের শাসনভার লাভ করেন। পূর্বে নয় লক্ষ টাকায় পূর্ণিয়ার ইজারা বন্দোবস্ত হত, কিন্তু কখনই পূর্ণিয়া থেকে ছয় লক্ষ টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হত না।
এমতাবস্থায় দেবী সিংহ যােল লক্ষ টাকায় পুর্ণিয়ার ইজারা নেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে তিনি নিরীহ প্রজাবর্গের ওপর চরম অত্যাচার শুরু করেন। প্রজারা ঘর-বাড়ি ত্যাগ করে পলায়ন করে এবং পূর্ণিয়া জনশূন্য শ্মশানে পরিণত হয়। সেখানে কৃষক বিদ্রোহ শুরু হলে গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস তাকে পদচ্যুত করেন।

অল্পদিনের মধ্যেই উৎকোচ প্রদানের মাধ্যমে তিনি হেস্টিংসকে বশীভূত করেন এবং হেস্টিংস তাকে ‘প্রাদেশিক রাজস্ব বাের্ডের সহকারী কর্মাধ্যক্ষ নিযুক্ত করেন। এই সময় তিনি স্বনামে-বেনামে নানা স্থানে জমিদারী ইজারা নেন এবং নানা ধরনের প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল সম্পত্তি গড়ে তােলেন। দুর্নীতির অভিযােগে তাকে পদচ্যুত করার দাবি উঠলে হেস্টিংস ‘রাজস্ব বাের্ড’ ভেঙে দেন।
এই সময় ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুরের রাজার মৃত্যু হলে ওয়ারেন হেস্টিংস তাকে দিনাজপুরের নাবালক রাজা রাধানাথ সিংহের দেওয়ান নিযুক্ত করেন। পরের বছর তিনি দিনাজপুর, রংপুর ও এদ্রাকপুর পরগনার ইজারা নেন। এরপর দিনাজপুর এবং রংপুর তার শশাষণ ও উৎপীড়নের প্রধান রঙ্গভূমিতে পরিণত হয়।

READ ALSO  শেয়ার বাজার কি এবং এর কাজ (Functions of the Stock Exchange)

দেবী সিংহের অত্যাচার

ইজারা নেওয়ার পরেই তিনি জমিদার ও প্রজাদের ওপর অবিশ্বাস্য হারে কর ধার্য করেন। ভূমিরাজস্ব ছাড়াও আরও নানা ধরনের কর আরােপিত হয় যা দেবার ক্ষমতা জমিদার বা প্রজা কারাে ছিল না। কর দিতে অসমর্থ জমিদারদের ওপর নানা অত্যাচার চলত অনেক সময় তিনি নামমাত্র মূল্যে তাদের জমিদারী কিনে নিতেন। এ সময় দিনাজপুরে বেশ কিছু মহিলা জমিদার ছিলেন। তারাও অত্যাচারের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাননি।

কৃষকদের অবস্থা ছিল আরও শােচনীয়। রাজস্ব অনাদায়ে তাদের অনাহারে কারাগারে রেখে বেত্রাঘাতে জর্জরিত করা হত। অজন্মার জন্যও খাজনা মকুব করা হত না। দেবী সিংহের অত্যাচার থেকে বাঁচবার জন্য তারা মহাজনদের শরণাপন্ন হত এবং তাদের কাছে জমি-জমা ঘর-বাড়ি বন্ধক রেখে খাজনার অর্থ ঋণ নিত। চক্রবৃদ্ধি হারে ঋণ বাড়তে থাকায় অচিরেই কৃষকরা ভূমিহীন ও গৃহহীন হয়ে পড়ে।

করভারে জর্জরিত কৃষকেরা প্রতিকার চেয়ে রংপুরের কালেক্টরের কাছে আবেদন করে। তারা জানায়—“আমরা গােরু-বাছুর বিক্রি করেছি, মেয়েদের গায়ে যা কিছু সামান্য অলঙ্কার ছিল—তাও বিক্রি করেছি। তারপরে আমরা ছেলেমেয়েদেরও বিক্রি করেছি। আজ আমাদের দেহ ছাড়া আর কিছুই সম্বল নেই। তবুও নায়েব, তহশীলদার আমাদের বাড়িতে ঢুকে আমাদের প্রহার করছে। বাশে বেঁধে মারছে। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে।” এই আবেদনেও কিন্তু কোন ফল হয়নি বরং দেবী সিংহের অত্যাচারই বৃদ্ধি পায়।

এই অবস্থায় বিদ্রোহ করা ছাড়া কৃষকদের সামনে আর কোন পথ ছিল না।
১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই জানুয়ারি রংপুরের কাজীর হাট, কাকিনা, ফতেপুর, ডিমলা প্রভৃতি স্থানের কৃষকরা তেপা গ্রামে সমবেত হয়ে দেবী সিংহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করে। বিদ্রোহী কৃষকরা একটি বিদ্রোহ ঘােষণা। সরকার গঠন করে এবং এই সরকার প্রায় পাঁচ সপ্তাহ ধরে স্বাধীনভাবে স্থানীয় শাসন পরিচালনা করে।
তারা নূরুলউদ্দিন-কে বিদ্রোহের নেতা বা ‘নবাব’ বলে ঘােষণা করে। দয়ারাম শীল নামে জনৈক প্রধান কৃষক সহকারী নেতা নিযুক্ত হন। নুরুলউদ্দিন দেবী সিংহকে খাজনা না দেওয়ার জন্য আদেশ জারি করেন এবং বিদ্রোহের ব্যয় নির্বাহের জন্য কৃষকদের ওপর ‘ডিং খরচা বা চাদা ধার্য করেন। হিন্দু-মুসলিম কৃষক ঐক্যবদ্ধ হয়ে রংপুরের সব জায়গা থেকে দেবী সিংহের রাজস্ব কর্মচারীদের বিতাড়িত করে।
তাদের হাতে অনেক কর্মচারী নিহত হয়। তারা ডাকালিগঞ্জের কয়েদখানা ভেঙে খাজনার দায়ে বন্দী কৃষকদের মুক্ত করে দেয়। বিদ্রোহ অচিরেই দিনাজপুর ও কুচবিহারে ছড়িয়ে পড়ে এক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। এ সময় রংপুরের কালেক্টর রিচার্ড গুডল্যাড কৃষকদের সুবিচারের আশ্বাস দিয়ে শান্ত হওয়ার পরামর্শ দেন। সরকারি আশ্বাসে কর্ণপাত না করে বিদ্রোহী কৃষকরা সরকারি কাছারি জ্বালিয়ে দেয় এবং খাজাঞ্চিখানা লুঠ করে।

READ ALSO  ওয়ারেন হেস্টিংস-এর শাসন সংস্কার, ১৭৭২-৮৪ খ্রিঃ

সরকার এবার বিদ্রোহ দমনে এগিয়ে আসে। উপদ্রুত অঞ্চলে সেনাবাহিনী পাঠানাে হয়। প্রায় এক হাজার কৃষক তীর, ধনুক, বর্শা নিয়ে ইংরেজ সেনার বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। মােগলহাট বন্দরে দু’পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। নবাব’ নূরুলউদ্দিন গুরুতরভাবে আহত ও বন্দী হন। দয়ারাম শীল নিহত হন। পাটগ্রামের যুদ্ধে বিদ্রোহীদের চূড়ান্ত পরাজয় হয়। বহু কৃষক হতাহত হয়। অনেকের ফাসি হয়।
তাদের খেত-খামার, ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বল্গাহীন অত্যাচারের দ্বারা সকল প্রতিবাদ গুড়িয়ে দেওয়া হয় (মার্চ, ১৭৮৩ খ্রিঃ)। কমিশনার পিটারসনের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপাের্টে কৃষকদের ওপর অত্যাচারের জন্য দেবী সিংহকে দায়ী করা হয়, কিন্তু বড়লাট হেস্টিংস অপর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেবী সিংহকে নির্দোষ বলে ঘােষণা করেন।

এই বিদ্রোহের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। (১) এই বিদ্রোহ হিন্দু-মুসলিম কৃষকের মিলিত facute (“One of the most distinguishing features of the revolt was that it was throughout marked by a rare combination of Hindus and Mus-lims.”- A Peasant Uprising in Bengal, Narahari Kabiraj, 1972, P. 38)। জাতিবর্ণ বা ধর্মগত পার্থক্য এই বিদ্রোহে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি (“Neither caste distinction nor communal differences obstructed the march of events.”–Do, P. 39)।

(২) এই বিদ্রোহ ছিল পুরােপুরি একটি কৃষক বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিল বিভিন্ন গ্রামের শত শত কৃষক নেতা বা মােড়ল (বসুনিয়া)। তারাই এই বিদ্রোহ সংগঠিত করেছিল। তাদের নেতৃত্বে প্রায় এক লক্ষ কৃষক এই বিদ্রোহে সামিল হয়। মােড়লদের বন্দী করতে গেলে সাধারণ কৃষকরা বাধা দিত এবং তাদের ছিনিয়ে নিত (“Actually the revolt of 1783 was a genuine peasant uprising. It was led by the village headmen or the bosneahs as they were called” .Do, P. 35}। কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে এই বিদ্রোহের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

READ ALSO  কোল বিদ্রোহ, ১৮৩২ খ্রিঃ ('The Kol Rebellion)

(১) রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ ছিল একটি স্থানীয় বিদ্রোহ এবং তার লক্ষ্য ছিল ইজারাদারের শােষণ-নিপীড়ন থেকে কৃষকদের মুক্তিলাভ। শত নিপীড়ন সত্ত্বেও বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করেনি–তারা বীরের মতাে মৃত্যুবরণ করেছে। এইভাবে রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ এক ব্রিটিশ-বিরােধী সংগ্রামের ঐতিহ্য সৃষ্টি করে পরবর্তীকালের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে।

(২) এই বিদ্রোহের ফলে কোম্পানী ইজারাদারী প্রথার কুফল গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তু সম্পর্কে তখন যে চিন্তাভাবনা চলছিল, রংপুরের বিদ্রোহ তাকে আরও জোরদার করে। পরবর্তীকালে লর্ড কর্নওয়ালিস ইজারা প্রথার অবসান ঘটিয়ে ১৭৯০-এ দশশালা বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন।

Leave a Comment