কোল বিদ্রোহ, ১৮৩২ খ্রিঃ (‘The Kol Rebellion)

কোল বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার কারণ, কোল বিদ্রোহ কেন হয়েছিল এবং এর কারণ কি, কোল বিদ্রোহ সম্পর্কে কিছু তথ্য, কোল বিদ্রোহ কি

Read More : রংপুর বিদ্রোহ ১৭৮৩ (The Rangpur Uprising)

Read More : নেতাজী ও আজাদ হিন্দ-বাহিনী – Netaji and Azad Hind-forces

কোল বিদ্রোহ, ১৮৩২ খ্রিঃ (‘The Kol Rebellion)

বিহারের ছােটনাগপুর অঞ্চলের অধিবাসী কোলরা হাে, মুণ্ডা, ওরাও প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল। তারা বহু কষ্টে অসাকীর্ণ জমিকে আবাদযােগ্য করে তুলেছিল। তারা জঙ্গলের সম্পদ অবাধে ভােগ করত এবং নিজেদের বিচার-পদ্ধতি অনুসরণ করে স্বাধীনভাবেই জীবনযাপন করত।

কোল বিদ্রোহ, ১৮৩২ খ্রিঃ

১৮২০ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানী সরাসরি ছােটনাগপুরের শাসনভার গ্রহণ করে এবং এই অঞ্চলে। কোম্পানীর নতুন ভূমি বন্দোবস্তের প্রকোপ শুরু হয়। রাজস্ব আদায়ের জন্য এই অঞ্চল হিন্দু, মুসলিম ও শিখ মহাজনদের ইজারা দেওয়া হয়। স্থানীয় উপজাতিরা এইসব বহিরাগতদের ‘দিকু’ বলত। উচ্চহারে রাজস্ব নির্ধারণ, মহাজনদের শােষণ, রাজস্ব আদায়ের নামে কোলদের ওপর সীমাহীন অত্যাচার তাদের বিক্ষুব্ধ করে তােলে।

ইজারাদাররা দরিদ্র কোলদের সর্বস্ব কেড়ে নিতে শুরু করে—বহুক্ষেত্রে তাদের জমি থেকে উৎখাত করা হয়। তাদের ওপর অতি উচ্চহারে ইচ্ছামতাে ও নানা ধরনের কর আরােপ করা হয়। কর আদায়ের জন্য তাদের নানাভাবে নিপীড়ন করা হত। পুরুষদের বন্দী করে রাখা হত। মেয়েদের নানাভাবে অপমান করা হত। সরকারি রাস্তা তৈরির জন্য তাদের বেগার খাটানাে হত। মদ ছিল তাদের নিত্যপ্রয়ােজনীয় বস্তু। মদের ওপর উচু হারে কর বসানাে হলে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে আফিম চাষে বাধ্য করা হয়।
আফিম চাষে তাদের ঘােরতর আপত্তি ছিল। তারা কালেক্টরকে জানিয়ে দেয় যে, তাদের থাকার মধ্যে আছে একখণ্ড ধুতি ও একটি পাগড়ি। এটুকু যদি চলেও যায়, তবু তারা আফিম চাষ করবে । ব্রিটিশ বিচার ও রাজস্ব-সংক্রান্ত আইনকানুন প্রবর্তন কোলদের প্রাচীন সমাজব্যবস্থা বিপর্যস্ত করে দেয়। এই শােষণ ও উৎপীড়নের প্রতিবাদে বুদু ভগত, জোয়া ভগত, ঝিরাই মানকি ও সুই মুণ্ডা কোলদের সমবেত করতে থাকে। নানা পদ্ধতি মারফৎ তারা গ্রামে গ্রামে বিদ্রোহের বার্তা ছড়িয়ে দিত।

READ ALSO  মহীশূরের পতনের কারণ (The reason for the fall of Mysore)

কখনও-বা নাকাড়া বাজিয়ে তারা লােক সংগ্রহ করত। অনেক সময় গ্রামে গ্রামে আম গাছের শাখা বা যুদ্ধের তীর বিলি করে বিদ্রোহের বার্তা পাঠাত। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে রাঁচী জেলায় মুণ্ডা ও ওরাও সম্প্রদায়ের কৃষকেরা সর্বপ্রথম বিদ্রোহ ঘােষণা করে। এক ঘােষণা জারি করে তারা বহিরাগতদের ছােটনাগপুর ত্যাগের নির্দেশ দেয় এবং জানিয়ে দেয় যে, এর অন্যথা হলে মৃত্যু নিশ্চিত। মহাজনরা তাদের হাতে পড়লে দেবতার সামনে তাদের বলি দেওয়া হত। মেজর সাদারল্যান্ড-এর মতে ইংরেজ- প্রবর্তিত নতুন রাজস্ব ব্যবস্থাই ছিল এই বিদ্রোহের মূল কারণ। ভেরিয়ার এলউইন-এর মতে জমি হাতছাড়া হওয়ার জন্যই এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ড. জগদীশচন্দ্র ঝা বলেন যে, কৃষি অসন্তোষই হল বিদ্রোহের প্রধান কারণ।

বিদ্রোহের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সিংভূম, মানভূম, হাজারীবাগ ও পালামৌ জেলার সর্বত্র বিদ্রোহ দেখা দেয়। চার্লস মেটকাফের মতে বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসন ধ্বংস করা। বিদ্রোহীরা সীমাহীন নিষ্ঠুরতার আশ্রয় গ্রহণ করে। জমিদার, জোতদার, শস্যব্যবসায়ী, সীমাহীন নিষ্ঠুরতা মহাজন, ইংরেজ কর্মচারী—এমনকি আদিবাসী নয়, এমন কোন মানুষই তাদের আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পায়নি। তারা জমিদার, মহাজন ও ব্যবসায়ীদের ইংরেজ শাসনের অঙ্গ বলেই মন করত।

বিদ্রোহীরা এইসব লােকদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযােগ করে তাদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। কেবল কামার ও ছুতােররাই তাদের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পায়, কারণ অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য কোম্পানীর শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় প্রতিক্রিয়া
প্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহের জন্য তাদের প্রয়ােজন ছিল। বিদ্রোহ দমনের জন্য কলকাতা, দানাপুর, বেনারস, সম্বলপুর ও পাটনা থেকে ক্যাপ্টেন উইলকিনসনের নেতৃত্বে সৈন্য পাঠানাে হয়। গােলন্দাজ বাহিনীও পথে নামে। বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের খণ্ডযুদ্ধ চলতে থাকে। দু’বছর চেষ্টার পর তীর-ধনুক ও বল্লমের বিপক্ষে আধুনিক অস্ত্রাদি ব্যবহার করে ইংরেজবাহিনী জয়যুক্ত হয়। হাজার হাজার আদিবাসী নর-নারী ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করে ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার এই বিদ্রোহ দমন করে।

READ ALSO  নেতাজী ও আজাদ হিন্দ-বাহিনী - Netaji and Azad Hind-forces

এই বিদ্রোহের ফলে সরকার উপলব্ধি করে যে, এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আশু পরিবর্তন প্রয়ােজন। এই উদ্দেশ্যে উপজাতিদের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সী’ নামে একটি ভূখণ্ড নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় (১৮৩৪ খ্রিঃ) এবং স্থির হয় যে, সেখানে ব্রিটিশ আইন-কানুন কার্যকরী হবে না। এই আদিবাসী এলাকার জন্য স্বতন্ত্র নিয়মকানুন প্রবর্তিত হয়।

জমিদারদের হাত থেকে গ্রাম-প্রধানদের জমি ফেরত দেওয়া হয় এবং জমিদার যাতে আবার জমি দখল করতে না পারে তার ব্যবস্থাও করা হয়। এসব সত্ত্বেও আদিবাসী সমস্যার সমাধান হয়নি। জমিদার-মহাজনদের শােষণ অব্যাহত থাকে। এই কারণে সারা উনিশ শতক ধরে মাঝে-মধ্যেই আদিবাসী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে।

Leave a Comment

WP Radio
WP Radio
OFFLINE LIVE